
কুষ্টিয়ায় সদরপুর ইউনিয়নে ধর্মীয় অনুভূতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গোরস্থানে জামায়াতের তিন নেতার টাকা বাণিজ্য সিন্ডিকেট
//কুষ্টিয়া নিউজ //
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের পুরাতন আজমপুর এলাকায় চাঁদা বকেয়ার দোহাই দিয়ে এক মৃত ব্যক্তির মরদেহ স্থানীয় গোরস্থানে দাফন করতে না দেওয়ার অমানবিক ঘটনার নেপথ্যে স্থানীয় তিন জামায়াত নেতার চরম অর্থলিপ্সা ও দ্বিমুখী রাজনীতির অভিযোগ উঠেছে।
গোরস্থান পরিচালনা কমিটির পদে থেকে ও পেছনে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণকারী এই তিন জামায়াত নেতা হলেন— সদরপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক আমির আতিয়ার হাজী, গোরস্থান কমিটির সভাপতি ও ইউনিয়ন জামায়াত নেতা আবুল হোসেন মাস্টার এবং গোরস্থানের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় ৫ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের মেম্বার পদপ্রার্থী মোজাম্মেল হোসেন সিদ্দিকী হাজ্বী। তাঁদের চাপিয়ে দেওয়া চাঁদা বাণিজ্য সিন্ডিকেটের কারণে মৃত নাসির উদ্দিনের (৫৪) মরদেহ দাফন নিয়ে দিনভর চরম ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পরিবারের অভিযোগ, আজমপুর পুরাতন পাড়া গোরস্থানের চাঁদা না দেওয়ার অজুহাতে প্রথমে তাঁদের কাছে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা দাবি করেন জামায়াত সমর্থিত পরিচালনা কমিটির কর্তাব্যক্তিরা। পরে টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত লাশ দাফনের অনুমতি মেলেনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার ভোর ৫টার দিকে মো: নাসির উদ্দিন মারা যান। তাঁর কোনো ছেলে সন্তান নেই, তিন মেয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁরা তড়িঘড়ি করে কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা দেন। পথেই তাঁদের কাছে খবর আসে, যে গোরস্থানে তাঁদের দাদা ও পূর্বপুরুষদের কবর রয়েছে, সেখানে নাসির উদ্দিনকে দাফন করতে দেওয়া হচ্ছে না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রথমে গোরস্থানের দায়িত্বে থাকা জামায়াত নেতারা দাবি করেন, নাসির উদ্দিন দীর্ঘদিন গোরস্থানের মাসিক বা বাৎসরিক চাঁদা পরিশোধ করেননি, তাই এককালীন ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। পরে স্বজনরা জানিয়ে দেন, হাতে যত টাকা আছে তা দিয়ে বাকি টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করবেন। এমনকি ২ থেকে ৩ কিস্তিতে টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন বলে দাবি করেন তাঁরা। কিন্তু তাতেও গোরস্থান কমিটির সভাপতি জামায়াত নেতা আবুল মাস্টারের মন গলেনি।
মৃতের বড় মেয়ে মোছা. নাসিমা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা তিন বোন ঢাকায় থাকি। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে দ্রুত বাড়ির উদ্দেশে রওনা হই। পথে চাচাতো ভাই ফোন করে জানায়, যেখানে আমাদের দাদা ও পূর্বপুরুষদের কবর রয়েছে সেখানে বাবাকে দাফন করতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রথমে বলা হয় ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা লাগবে। আমরা টাকা দিতে রাজি ছিলাম, প্রয়োজনে কিস্তিতেও দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে বলা হয়, কোনো টাকা দিলেও বাবাকে সেখানে দাফন করা হবে না। একজন মৃত মানুষকে এভাবে ফিরিয়ে দেওয়া খুব কষ্টের।"
এদিকে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা জানান, নাসির উদ্দিনের বাবা মৃত আহমদ আলী ওই গোরস্থানের নিবন্ধিত সদস্য ছিলেন এবং তাঁকে সেখানেই দাফন করা হয়েছিল। তাই নাসির উদ্দিনের পরিবারও স্বাভাবিকভাবেই পূর্বপুরুষের একই গোরস্থানে দাফনের আশা করেছিল।
মৃতের বাড়ির সামনে থাকা মুদি দোকানি মো. সেলিম বলেন, "নাসিরের বাবা ওই গোরস্থানের সদস্য ছিলেন। তাঁর কবরও সেখানে আছে। নাসির মারা যাওয়ার পর তাঁর বড় মেয়ে সভাপতি আবুল মাস্টারের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বলেন, যত টাকা লাগে দেবেন, শুধু বাবাকে দাফন করতে দিতে হবে। কিন্তু তারপরও জামায়াত সমর্থিত কমিটি অনুমতি দেয়নি।পরে মানবিক কারনে সদরপুর ইউনিয়ন বিএনপি সেক্রেটারি আশরাফুল হক আশা তাঁর পারিবারিক গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করেন।
সদরপুর ইউনিয়নের বিএনপির সেক্রেটারি আশরাফুল হক আশা বলেন, "নাসির উদ্দিনের বাবা নিয়মিত চাঁদা দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর নাসির আর চাঁদা দেয়নি। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার এককালীন টাকা দিতেও রাজি হয়েছিল। শুনেছি তখন জামায়াত নেতারা প্রায় ৪৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে বলা হয়, টাকা লাগবে না, তবুও তাঁকে দাফন করা হবে না। তখন মানবিক দায়িত্ব থেকে আমি আমার পারিবারিক গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করি।"
তিনি আরও বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে বলেন, "কবর অর্ধেক খনন হওয়ার পর এলাকার কয়েকজন জামায়াতের নেতা-কর্মী এসে বলেন, এতে নাকি তাদের দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং মরদেহ অন্য গোরস্থানে নেওয়া হোক! কিন্তু পরিবারের সদস্যরা বলেন, যেখানে কবর খোঁড়া হয়েছে সেখানেই দাফন করা হবে। মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা কবরস্থান, অথচ এটি নিয়ে জামায়াত নেতাদের রাজনীতি ও বিভেদ সৃষ্টি করা চরম দুঃখজনক।"
ঘটনার পর এলাকায় জোর গুঞ্জন ও আলোচনা তৈরি হয় যে, ইউনিয়ন জামায়াত সাবেক আমির আতিয়ার হাজীর ইন্ধনেই গোরস্থান কর্তৃপক্ষ এমন কঠোর ও নির্দয় অবস্থান নেয়। স্থানীয়রা জানান, রাজনৈতিক প্রতি হিংসা থেকেও এটি হতে পারে; কারণ নাসির উদ্দিনের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ভালো সম্পর্ক ছিল, যদিও তিনি নিজে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
তবে নিজের দলীয় ইন্ধন ও কেলেঙ্কারির অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন—সদরপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক আমির হাজী আতিয়ার, গোরস্থান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ইউনিয়ন জামায়াত নেতা আবুল হোসেন (আবুল মাস্টার) এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের মেম্বার পদপ্রার্থী মোজাম্মেল হোসেন সিদ্দিকী হাজী।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জামায়াত সমর্থিত নেতারা দায়সারা ও বিতর্কিত বক্তব্য দেন:
সদরপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক আমির হাজী আতিয়ার বলেন, "আমাদের গোরস্থান আলাদা।আবুল মাস্টার এলাকার উন্নয়নের স্বার্থেই ৪০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। এটা নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নেই। নাসির উদ্দিন আমার চাচাতো ভাই। তাকে ওই গোরস্থানে দাফন করতে না দেওয়ার কথা শুনে আমি বরং সেখানে দাফনের চেষ্টা করেছি। আমি বহুবার গোরস্থান আবুল মাস্টার এমন নীতির সমালোচনা করেছি।
অন্যদিকে গোরস্থান কমিটির সভাপতি ও ইউনিয়ন জামাত নেতা আবুল মাস্টার বলেন, আমাদের গোরস্থানে প্রায় ১৪০ জন সদস্য রয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা রাজি না থাকলে আমার কিছু করার নেই। টাকা দাবির সিদ্ধান্ত একা আমার নয়, পুরো কমিটির। একইসাথে, গোরস্থানের পরিচালনা ও প্রশাসনিক দায়িত্বে যুক্ত থাকা স্থানীয় ৫ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের মেম্বার পদপ্রার্থী মোজাম্মেল হোসেন সিদ্দিকী হাজ্বী নিজের দায় এড়ানোর কৌশল নিয়ে বলেন, "নাসিরের বাবা গোরস্থানে সদস্য ছিলেন, কিন্তু নাসির নিজে না হওয়ায় কমিটির সভাপতি গোরস্থানের উন্নয়নের কথা বলে টাকা চেয়েছেন। আমি মূলতঃ স্থানীয় মসজিদের দায়িত্বে আছি, এ বিষয়ে সভাপতি আবুল মাস্টারের সাথেই কথা বলা ভালো।
দীর্ঘ সময় লাশ আটকে থাকার পর মানবিক দিক বিবেচনায় এগিয়ে আসেন সদরপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফুল হক আশা। তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতির নিরসন ঘটিয়ে মরহুম নাসির উদ্দিনকে তাঁর নিজস্ব পারিবারিক গোরস্থানে দাফনের সুব্যবস্থা করেন। বেলা আড়াইটায় মরহুমের দাফন-কাফন সম্পন্ন হয়। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি সাধারণ গোরস্থানে দাফনের জন্য চাঁদা বাধ্যতামূলক করা কতটা যুক্তিসংগত এবং একজন মৃত ব্যক্তিকে পূর্বপুরুষদের পাশে দাফনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা মানবিকতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, সাধারণত জনসাধারণের ব্যবহৃত গোরস্থানে এ ধরনের নিয়ম থাকে না। তবে যদি এটি সম্পূর্ণ পারিবারিক গোরস্থান হয়, তাহলে আলাদা বিষয়। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরুর মুঠোফোনে
সামাজিক গোরস্থানকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এবং মৃতদেহ আটকে রেখে অর্থ দাবিকে ধর্মীয় অনুভূতির পরিপন্থী ও চরম নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন সমাজ। এ ঘটনার সাথে জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।